ঘরে বসে দারাজে ব্যবসা: নতুন সেলারদের জন্য ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ গাইড
ভূমিকা
বর্তমান সময়ে যদি বিজনেসের কথা বলা হয় তবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে আছে ই-কমার্স বিজনেস। বর্তমানে এই ডিজিটাল যুগে মানুষ এখন আর মার্কেটে গিয়ে কেনাকাটা না করে ঘরে বসেই অনলাইনে পণ্য অর্ডার করে থাকে। যার ফলশ্রুতিতে ই-কমার্স বিজনেসের চাহিদা বেড়েছে কয়েক গুণ। শহর থেকে গ্রাম সব জায়গাতেই এখন ক্রেতারা পছন্দের পণ্য অর্ডার করছেন কয়েকটি ট্যাপে। আর বাংলাদেশের এমন একটি ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম এর নাম হচ্ছে দারাজ, যার জনপ্রিয়তা এখন সবার শীর্ষে। বিস্তৃত পণ্য, নিয়মিত দারুন সব অফার, ক্যাশ অন ডেলিভারি, এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে পণ্য পৌঁছে দেয়ার মাধ্যমে দারাজ এক নম্বর স্থান ধরে রেখেছে, সেই সাথে ক্রেতা বিক্রেতাদের আস্থাও ধরে রেখেছে কয়েক বছর ধরে। তাই দেশের মানুষের অনলাইনে কেনাকাটার একমাত্র ভরসা এখন দারাজ।
তবে দারাজ এখন শুধু কেনাকাটা বা ক্রেতা বিক্রেতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং উদ্যোক্তাদের জন্য দারুন সুযোগ তৈরি করেছে। আপনি যদি চান অল্প পুঁজিতে অনলাইনে ব্যবসা করবেন তাহলে দারাজ আপনাকে সেই সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে । প্রয়োজন শুধু আপনার ইচ্ছা শক্তি পরিশ্রমের আর সঠিক পরিকল্পনা।
| দারাজ সেলার হয়ে আয় শুরু থেকে সফল হওয়ার সম্পুর্ণ গাইড |
এই তিনটি বিষয়ে যদি আপনার ঠিক থাকে তাহলে আজ থেকেই দারাজের সাথে যুক্ত হয়ে দারাজের পণ্য সারা দেশব্যাপী বিক্রি করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারেন। কিভাবে শুরু করবেন তা জানতে পুরো আর্টিকেলটি মনোযোগ দিয়ে পড়ুন। এই আর্টিকেলে আপনি জানতে পারবেন দারাজ সেলার একাউন্ট খোলার পদ্ধতি, পন্য নির্বাচন ও তালিকাভুক্তির কৌশল, অর্ডার ম্যানেজমেন্ট এবং বিক্রি বাড়ানোর কার্যকর টিপস, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়লে আপনি দারাজে ব্যবসা শুরু করার একটি স্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত ধারণা পাবেন।
কেন দারাজ সেলার হিসেবে ব্যবসা শুরু করবেন?
বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে ই-কমার্স ব্যবসা করতে গেলে অনেক বিষয়ে মাথায় রাখতে হয়। যেমন পণ্য, সঠিক সাপ্লায়ার, লজিস্টিক সিস্টেম, ডেলিভারি, পেমেন্ট মেথড, মার্কেটিং কৌশল, স্টক ও ইভেন্টরি ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদি। একজন স্বল্প পুঁজি ওয়ালা উদ্যোক্তার পক্ষে এত কিছু একসাথে ম্যানেজ করা খুব কঠিন হয়ে যায়। আর দারাজ আপনাকে এই সবগুলো সুবিধা একসাথে দিচ্ছে ব্যবসা করার জন্য।
কেন আপনার অন্য প্লাটফর্ম বাদ দিয়ে দারাজের সাথে কাজ করা উচিত বলে আমি মনে করি নিম্নে তার কারণ গুলো তুলে ধরা হলো
বিশাল কাস্টমার বেইজ
দারাজের কাস্টমার এর পরিধি এখন ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল গ্রামগঞ্জে শহরের অলিতে গলিতে এমন জায়গা পাওয়া যাবে না যেখানে দারাজের কাস্টমার নেই। এই লক্ষ লক্ষ ক্রেতার কারণে দারাজে যুক্ত হয়ে নিজের পণ্য সারা দেশে বিক্রি করে করার জন্য ক্রেতা খুঁজতে হয় না বরং ক্রেতারা দারাজের পণ্য খোঁজে। ফলে দারাজের পণ্য বিক্রি করা অনেক সহজ হয়।
লজিস্টিক সাপোর্ট
নতুন ব্যবসায়ীদের জন্য আরেকটি বড় ঝামেলা হচ্ছে ডেলিভারি করা। আপনি যদি আলাদাভাবে ই-কমার্স বিজনেস শুরু করতে চান তাহলে এই ডেলিভারির জন্য আপনাকে অনেক হয়রানি পোহাতে হবে। কিন্তু যদি দারাজের সাথে কাজ করেন তাহলে এই ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকা যাবে শতভাগ। তাদের নিজস্ব ডেলিভারি সিস্টেম রয়েছে যার মাধ্যমে তারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ডেলিভারি করে থাকে।
ফ্রি মার্কেটিং ও প্রোমোশন সুবিধা
দারাজ বিভিন্ন উপলক্ষে ফ্ল্যাশ সেল, ভাউচার ক্যাম্পেইন করে থাকে যা প্রোডাক্ট বিক্রি করতে আলাদা একটা সুবিধা দেয়। তাছাড়া ব্যবসার প্রচারের জন্য বিজ্ঞাপনের দরকার যা দারাজ ফ্রিতে করার সুযোগ দেয় এবং প্রমোশনের সুযোগ দেয়।
স্বল্প পুঁজিতে ব্যবসা শুরু করার সুবিধা
সর্বোপরি যারাদের সাথে কাজ করলে স্বল্প মূলধনে ব্যবসা করার সুযোগ আছে। যেমন দোকান ভাড়া, ডেকোরেশন, প্রোডাক্ট স্টক রাখা ইত্যাদি ঝামেলা নেই তাই স্বল্প পুজিতে ঘরে বসেই অনলাইনে এই ব্যবসা করা যায়।
দারাজ সেলার হওয়ার প্রাথমিক শর্তাবলী
- এক লোকাল সেলার
- দুই কর্পোরেট সেলার
আপনি যদি ব্যক্তিগতভাবে ছোট পরিসরে তাদের সাথে যুক্ত হয়ে কাজ করতে চান তার জন্য লোকাল সেলার একাউন্ট খোলার যথেষ্ট। আর যদি প্রতিষ্ঠানিকভাবে তাদের সাথে কাজ করতে চান তাহলে কর্পোরেট একাউন্ট খুলতে হবে তবে সেক্ষেত্রে ট্রেড লাইসেন্স প্রয়োজন।
এই দুই ধরনের একাউন্ট এর জন্য কিছু প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস বা কাগজপত্র লাগবে।
- ভেরিফিকেশনের জন্য জাতীয় পরিচয় পত্রের কপি।
- টাকা লেনদেনের জন্য ব্যাংক একাউন্ট।
- একটা সচল ফোন নাম্বার।
- জিমেইল এড্রেস।
এই কয়েকটি প্রাথমিক ডকুমেন্ট সঠিকভাবে সাবমিট করার মাধ্যমেই আপনি দারাজে আপনার ব্যবসার প্রথম ধাপটি সফলভাবে শুরু করতে পারবেন।
দারাজ সেলার একাউন্ট খোলার নিয়ম
দারাজ সেলার একাউন্ট খোলার জন্য প্রথমে দারাজ অ্যাপস থেকে বা সরাসরি ব্রাউজার থেকে দারাজ সেলার সেন্টারে চলে যান। সেখান থেকে become a seller অপশনে ক্লিক করে প্রয়োজনীয় ইনফরমেশন দিয়ে ফোন নাম্বার দিয়ে ভেরিফিকেশন করে নিন ব্যাস প্রথম ধাপে রেজিস্ট্রেশন শেষ।
প্রথম ধাপের রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হয়ে গেলে আপনার প্রোফাইলে কিছু কাজ কমপ্লিট করতে হবে। যেমন এন আই ডি এবং ব্যাংক একাউন্টের যাবতীয় তথ্য দিয়ে সাবমিট করতে হবে। সবকিছু ঠিক থাকলে রিভিউ করে আপনার অ্যাকাউন্টটি এক্টিভ করে দেবে এক্ষেত্রে দুই থেকে তিন দিন সময় লাগবে। অ্যাকাউন্ট একটিভ হয়ে গেলে প্রোফাইলে ব্যবসার যাবতীয় নিয়ম কানুন ফ্রি ট্রেনিং ও টিউটোরিয়াল শো করবে এই ভিডিওগুলো এখান থেকে দেখে শেষ করতে হবে।
লাভজনক পণ্য নির্বাচন ও সোর্সিং
অ্যাকাউন্ট একটিভ হওয়ার পর আপনার প্রথম কাজ হল আপনার লাভজনক প্রোডাক্ট নির্বাচন করা এবং সোর্সিং করা।তবে যেই প্রোডাক্টটি সোর্সিং করেন না কেন সোর্সিং করার আগে অবশ্যই মার্কেটে রিসার্চ এবং বিশ্লেষণ করবেন। মার্কেটে কোন প্রোডাক্ট এর চাহিদা বেশি সেটা বোঝার জন্য দারাজে গিয়ে বেস্ট সেলিং প্রোডাক্টগুলো দেখে নিন। সাধারণত মোবাইল ও ইলেকট্রনিক্স গেজেট, মেয়েদের ও ছেলেদের ফ্যাশন আইটেম, হোম ডেকর এবং কসমেটিক্স সামগ্রীর চাহিদা কি ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম গুলোতে সব সময় শীর্ষে থাকে।
এছাড়াও দারাজের ফ্ল্যাশ সেল, টপ রেটেড, বেস্ট সেলার ক্যাটাগরির সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ রাখুন এতে চাহিদা সম্পন্ন প্রোডাক্ট গুলো সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা আসবে।
ট্রেন্ডিং প্রোডাক্ট এবং চিরসবুজ প্রোডাক্ট সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখতে হবে। কারণ ট্রেনডিং প্রোডাক্টগুলো সেজনালি অনেক বিক্রি হয়। কিন্তু সিজন চলে গেলে স্টক আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। অন্যদিকে চিরসবুজ প্রোডাক্ট গুলো সারা বছরেই বিক্রি হয় তাই আপনার অনলাইন ব্যবসা কে দীর্ঘায়িত করতে ৭০% চিরসবুজ প্রোডাক্ট এবং ৩0%ট্রেন্ডিং প্রোডাক্ট রাখা ভালো একটা কৌশল।
প্রোডাক্ট নির্বাচন করার পর আপনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে বা লাভ লসের হিসাব করা। কারণ সঠিকভাবে লাভ-ক্ষতি হিসাব না করতে পারলে ব্যবসায় ধস আসতে পারে। যে কোন প্রোডাক্টের দাম নির্ধারণ করার আগে অনুমানের ওপর দাম নির্ধারণ করা ঠিক না। পন্যের ক্রয় মূল্য, প্যাকেজিং খরচ, ভ্যাট, পেমেন্ট ফি, সব কিছু বাদ দিয়ে কতটুকু প্রফিট থাকছে তা নিখুত ভাবে হিসেব করে তারপর দাম নির্ধারণ করতে হবে।
প্রোডাক্ট নির্বাচন করা হয়ে গেলে আপনার কাজ হচ্ছে নির্ভরযোগ্য স্থান থেকে ইমপোর্ট করা। বেশি লাভ করতে চাইলে পাইকারি বা রিটেলারের কাছ থেকে প্রোডাক্ট না কিনে সরাসরি ইমপোর্টার বা উৎপাদকের কাছ থেকে পণ্য কেনার চেষ্টা করুন। পোশাকের জন্য ইসলামপুর, কসমেটিক্স ও ইমিটেশনের জন্য চকবাজার, বা ইলেকট্রনিক্স এর জন্য নবাবপুর হতে পারে চমৎকার সোর্স।
প্রোডাক্ট লিস্টিং ও এসইও
দারাজে হাজার হাজার বিক্রেতা একই ধরনের পণ্য বিক্রি করেন। তাই ভালো পণ্য থাকলেও লিস্টিং দুর্বল হলে ক্রেতা সেটি খুঁজে পান না। তাই সঠিক লিস্টিং ও এসইও করতে হবে যাতে আপনার পণ্যকে search result এর উপরে তুলে আনে।
প্রথমেই কাস্টমারদের আকর্ষণ করার জন্য একটা চমৎকার এসইও ফ্রেন্ডলি টাইটেল লিখতে হবে। এর জন্য কিওয়ার্ড রিসার্চ করে খুঁজে বের করতে হবে কাস্টমাররা কোন কোন কিওয়ার্ড দিয়ে সার্চ করছে। এবং কৌশলে এই কিওয়ার্ডগুলো টাইটেলের সাথে যুক্ত করে দিতে হবে। যেমন শুধু "শার্ট" না লিখে ছেলেদের ক্যাজুয়াল কটন হাফ হাতা শার্ট লেখলে আপনার পণ্যটি সার্চ রেজাল্টে আসার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায় ।
টাইটেল এর পরেই পণ্যের ডেসক্রিপশন এবং স্পেসিফিকেশন লিখতে হবে। মনে রাখবেন কাস্টমার সরাসরি পণ্য চেক করতে পারেনা ।তাই এখানে পণ্যের ডেসক্রিপশন এবং স্পেসিফিকেশন এমন ভাবে লিখতে হবে যেন কাস্টমার ডেসক্রিপশন পড়েই পণ্য সম্পর্কে পুরোপুরি ধারণা পান এবং কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। পন্যের সাইজ, কালার, মেটেরিয়াল, ওয়ারেন্টি এবং বিশেষ গুণাবলী বুলেট পয়েন্ট আকারে স্পষ্টভাবে সাজিয়ে লিখতে হবে। এখানে কাস্টমারদের আকর্ষণ করতে অতিরঞ্জিত কিছু লেখা যাবে না।
অনলাইন কেনাকাটায় পণ্যের ছবি খুব গুরুত্বপূর্ণ ছবিটা কে স্পষ্ট করে এবং হাই কোয়ালিটি সম্পূর্ণ ছবি তুলতে হবে এবং ব্যাকগ্রাউন্ড সাদা করে দিতে হবে যাতে কাস্টমার বুঝতে পারে। এবং বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে একাধিক ছবি আপলোড করতে হবে সে সাথে প্রোডাক্টের একটা ছোট ভিডিও দিলে কাস্টমারের জন্য আরো বেশি সুবিধা হয়।
সবশেষে পণ্যের ক্যাটাগরিতে গুরুত্ব দিন এক ক্যাটাগরির পণ্য আরেক ক্যাটাগরিতে আপলোড করলে পণ্যের এসইও ভালো হয় না এবং পণ্য খুঁজেও পাওয়া যাবে না। সুতরাং পন্যের ক্যাটাগরি এবং সাব ক্যাটাগরি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করুন।

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url